মার্কিন অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি ফেরাতে পারবে ফেডের সুদহার কর্তন?

যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপিতে শ্লথতার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের দুরবস্থা।

যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপিতে শ্লথতার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের দুরবস্থা। বিশেষ করে শ্রমবাজারের তথ্য ভাবিয়ে তুলছে দেশটির নীতিনির্ধারকদের। এমন এক পরিস্থিতিতে চলতি সপ্তাহেই এক নীতিনির্ধারণী বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) কর্তাব্যক্তিরা। সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা, ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির (এফওএমসি) বৈঠকে চলতি বছরে প্রথমবারের মতো সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

মূল্যস্ফীতির শঙ্কা মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বেশ আঁটসাঁট মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে ফেড। এ নিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের টানাপড়েনও তৈরি হয়েছে অনেক। এ টানাপড়েন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বিবেচিত ফেডের নীতি প্রণয়নের স্বাধীনতা বজায় রাখা নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা। তবে শেষ পর্যন্ত ফেড সুদহার কমানোর পথেই হাঁটবে বলে মনে করছেন সবাই। তবে ফেডের এমন সিদ্ধান্ত মার্কিন অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত মাত্রায় গতি ফেরাতে পারবে কিনা সে বিষয় নিয়েও রয়েছে নানামুখী আলোচনা।

মার্কিন সরকারের বিভিন্ন দপ্তর সম্প্রতি একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে দ্রুত ভোক্তা মূল্যবৃদ্ধি তথা মূল্যস্ফীতি ও শ্রমবাজারে দুর্বলতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে এফওএমসি ২৫ বেসিস পয়েন্টের বেশি হারে সুদহার কমাবে না বলে মনে করা হচ্ছে।

দেশটিতে সুদহার কর্তনের পক্ষে বলা হচ্ছে, ঋণের ব্যয় বেশি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে মূলধনের প্রবাহ এখন চাপের মুখে। ফলে নতুন কর্মসৃজন কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার সরকারকেও বিপুল পরিমাণ ঋণের সুদ বহন করতে হচ্ছে। এ চাপ কমানোর জন্য সুদহার হ্রাসের কোনো বিকল্প নেই।

কোনো কোনো অর্থনীতিবিদের ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে এ মুহূর্তে সুদহার পরিমিত মাত্রায় কর্তন করা যেতে পারে। কিন্তু ট্রাম্পঘনিষ্ঠসহ বিভিন্ন স্থান থেকে যে মাত্রায় দাবি করা হচ্ছে, তা বাস্তবায়ন করতে গেলে আরো বড় বিপত্তির আশঙ্কা রয়েছে। অর্থপ্রবাহ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্পের শুল্কহারের কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। দেশটিতে কর্মসংস্থানের হার যথেষ্ট মাত্রায় বাড়ানো না গেলে এ মূল্যস্ফীতির প্রভাব আরো কঠোর হবে।

মার্কিন শ্রম দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কর্মসংস্থান ও কর্মস্থল পরিবর্তনের সুযোগ (জেওএলটিএস) ৭১ লাখ ৮০ হাজারে নেমে আসে, যা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন এবং প্রত্যাশার তুলনায় কম। দেশটির বেসরকারি খাতে আগস্টে নতুন চাকরির সংখ্যা ছিল বাজার প্রত্যাশার চেয়ে কম, ৫৪ হাজার। বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২১ সালের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ। এছাড়া ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক সপ্তাহে বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেছেন ২ লাখ ৬৩ হাজার, যা ২০২১ সালের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ।

মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদক মূল্যসূচক (পিপিআই) আগস্টে দশমিক ১ শতাংশ কমেছে, যা এপ্রিলের পর প্রথম মাসিক পতন। বার্ষিক ২ দশমিক ৬ শতাংশ পিপিআই বৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় কম। অন্যদিকে আগস্টে ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) বেড়েছে দশমিক ৪ শতাংশ। মাসিক ভিত্তিতে সিপিআই প্রত্যাশার তুলনায় বেশি হলেও তা ফেডের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ সময়ে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। উৎপাদনকারী পর্যায়ে ধীরগতিতে মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি—এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ সুদহারে অল্প কর্তন ও কঠোর সতর্কভাব বজায় রাখে ফেড।

সম্প্রতি পিপিআই ডাটা প্রকাশের পর ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে লক্ষ্য করে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির চাপ আর নেই, এখনই বড়সড় হারে সুদ কমানো উচিত।’

অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মুখপাত্র জুলি কোয্যাক বলেন, ‘চাকরির বাজারে বিদ্যমান নেতিবাচক ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে সুদহার হ্রাসের পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে ফেডের।’

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শ্লথগতি ও ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে সুদ বাবদ সরকারি ব্যয় কমানোর জন্য তৎপর ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও চলতি বছর এখনো একবারও সুদহার কমায়নি ফেড।

মূলত মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী ঝুঁকি মোকাবেলায় সতর্কতা অবলম্বন করে আসছেন ফেড চেয়ারম্যান। গ্রীষ্মের শুরুতে মূল্যস্ফীতির কমার ইঙ্গিত থাকলেও মার্কিন অর্থনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত শুল্কের প্রভাব পর্যবেক্ষণে রেখেছিল ফেড। তাই এফওএমসির সর্বশেষ বৈঠকেও সুদহার ৪ দশমিক ২৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সীমার মধ্যে অপরিবর্তিত রাখা হয়। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে এ সুদহার নির্ধারণ করেছিল মার্কিন আর্থিক খাতের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে আটকে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (এইআই) সিনিয়র ফেলো স্টিভেন কামিন। তিনি বলেন, ‘সিপিআই বৃদ্ধি প্রত্যাশিত ছিল, তবে ট্রাম্পের শুল্ক মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে। আগস্টে হেডলাইন ও কোর সিআইপি উভয়ই বেড়েছে, যা অব্যাহত থাকলে ফেডের মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্যকে অনেক বেশি মাত্রায় ছাড়িয়ে যেতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সিপিআই ডাটা দেখে চলতি বছর দুবার সুদহার কর্তনের আহ্বান করছি। একবার সেপ্টেম্বরে, আরেকবার ডিসেম্বর—যদিও আগে আমি তিনবার কাটছাঁট আশা করেছিলাম। বেকার ভাতা বৃদ্ধির সূচক তিনবার কর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে গত কয়েক বছরে শ্রমবাজারে এ ধরনের বৃদ্ধি স্থায়ী হয়নি, তাই আমি একে উপেক্ষা করছি।’

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সূচকগুলো বিবেচনা করে ছোট আকারে সুদহার কমাতে পারে ফেড। এতে সূচকগুলোয় উন্নতি দেখা যেতে পারে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ রায়ান সুইটের মতে, শ্রমবাজারের তথ্যানুযায়ী কঠিন অবস্থায় রয়েছে ফেড। একই সময়ে তারা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান নিশ্চিতের চেষ্টায় রয়েছে। তবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি আশ্বাস দেয় যে ডিসেম্বরের পরিবর্তে সেপ্টেম্বরে সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। হেডলাইন মূল্যস্ফীতি সামান্য বেশি হয়েছে। তবে তার অনেকটাই উড়োজাহাজ ভাড়ার মতো অস্থিতিশীল কিছু খাতের কারণে, যা সাময়িক ও স্থায়ী নয়।

তিনি আরো বলেন, ‘আমদানি শুল্কের আর্থিক চাপ ভোক্তাদের ঘাড়ে পড়ায় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে পরিষেবা খাতে মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি শ্রমবাজারের অবস্থার ওপর পরিবর্তন হয়।’

রায়ান সুইট বলেন, ‘এখন মূলত মূল্যস্ফীতির আশঙ্কার কারণেই সতর্কতা অবলম্বন করছে ফেড। কিন্তু মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে এমন ঐকমত্য তৈরি হচ্ছে যে শুল্কের কারণে পণ্যের দাম এককালীন বাড়লেও ট্যারিফ রেটে কার্যকর পরিবর্তন বাস্তবায়ন এবং ভোক্তামূল্যে এর প্রভাব বিলম্বিত হওয়ায় এ ঘটনা ঘটবে (ল্যাগ ইফেক্ট) কয়েক মাস ধরে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাজারভিত্তিক মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশামাফিক স্থিতিশীল থাকায় ফেড সেপ্টেম্বরে সুদহার কমাতে পারবে। কিন্তু কর্মসংস্থান তথ্য বলছে, এ মুহূর্তে ৫০ বেসিস পয়েন্ট সুদহার কমানোর ঝুঁকি নেবে না ফেড।’

আরও